
এনএনবি
বিরল খনিজকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আবারও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এই খাতকে নতুন
করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব দাবি করেছে, তাদের
ভূখণ্ডে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের খনিজ সম্পদ রয়েছে—যা দেশটিকে বিরল
খনিজের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
সৌদি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, দেশটিতে সোনা, দস্তা, তামা ও লিথিয়ামের পাশাপাশি
ডিসপ্রোসিয়াম, টার্বিয়াম, নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়ামের মতো বিরল ভূ-উপাদান
পাওয়া যাচ্ছে। এসব খনিজ বৈদ্যুতিক যান, উইন্ড টারবাইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,
উচ্চগতির কম্পিউটিং এবং আধুনিক সামরিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য।
বর্তমানে এই খাতে চীনের প্রভাব স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ)
তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে পরিশোধিত বিরল খনিজের ৯০ শতাংশের বেশি এবং মোট উৎপাদনের
৬০ শতাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করছে দেশটি।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি ২০২৫) সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তেলনির্ভর
অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে সৌদি আরব খনিজ খাতকে কৌশলগত অগ্রাধিকার
দিচ্ছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির অনুসন্ধানমূলক খনন বাজেট বেড়েছে
প্রায় ৫৯৫ শতাংশ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে নতুন খনির লাইসেন্স দেওয়া
হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, খনন ও পরিশোধন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া—একটি
পরিশোধনাগার স্থাপনে তিন থেকে পাঁচ বছর, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক দশক সময়ও
লাগতে পারে।
এই বাধা কাটাতে সৌদি সরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, কর ছাড় এবং বড় বিনিয়োগ
পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ‘ফিউচার মিনারেলস ফোরাম’-এ দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত খনি
কোম্পানি মাদেন ঘোষণা দিয়েছে, আগামী এক দশকে ধাতু ও খনিজ খাতে ১১০ বিলিয়ন ডলার
বিনিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও দক্ষ জনবল আকর্ষণেও জোর
দেওয়া হচ্ছে।
‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনায় খনিজ খাতকে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি
হিসেবে ধরা হয়েছে। সৌদি আরব শুধু খননেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং বৈদ্যুতিক
যানবাহনসহ দেশীয় শিল্পের জন্য সম্পূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে।
শক্তিশালী অবকাঠামো ও তুলনামূলক সস্তা জ্বালানির কারণে অন্য দেশ থেকে আহরিত
খনিজ পরিশোধনের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবেও সৌদি আরবের সম্ভাবনা দেখছেন
বিশ্লেষকেরা।
এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহও বাড়ছে। চীন ভারী বিরল খনিজ রপ্তানিতে
নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর বিকল্প উৎস ও পরিশোধন কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। সৌদি
আরবে একটি নতুন পরিশোধনাগার গড়তে মার্কিন কোম্পানি এমপি ম্যাটেরিয়ালস, সৌদি
মাদেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পথটি সহজ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা, কূটনৈতিক
সমীকরণ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তবুও সৌদি আরবের কৌশল
স্পষ্ট—তাৎক্ষণিক মুনাফার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও ভূরাজনৈতিক শক্তি অর্জন।
এই পরিকল্পনা সফল হলে বিরল খনিজের বৈশ্বিক মানচিত্রে নতুন কেন্দ্র হিসেবে
আবির্ভূত হতে পারে দেশটি।
COMMENTS