![]() |
| বিটেকের প্রতারণামূলক ব্যানার |
বিষেশ প্রতিনিধি
সাধারণ মানুষদের বিশ্বের অর্থনীতি বদলে ফেলার মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম ও অবৈধ এমএলএম ব্যবসা গাজীপুরজুড়ে মহামারীর মত জেঁকে বসেছে।
এক সময় ডেসটিনি দেশের সম্ভাবনাময় লাখ লাখ যুবককে কোটিপতি হওয়ার মিথ্যা স্বপ্ন দেখিয়ে পথে বসায়। সে সময় সরকার আইন করে পিরামিড স্কিম নিষিদ্ধ করে আর এমএলএম ব্যবসার জন্য লাইসেন্সিং প্রথা চালু করে। কিন্তু বর্তমানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠা কোন প্রতিষ্ঠানেরই এমএলএম ব্যবসার লাইসেন্স নেই। আর পিরামিড স্কিমতো নিষিদ্ধই।
নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম ও অবৈধ এমএলএম ব্যবসায় একজন মানুষের লাভ করতে হলে তার সাথের মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করতে হয়। ঠকাতে হয়। কোম্পানির লোকেরা জনগণের টাকা মেরে দিয়ে গা ঢাকা দেয়, হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে এবং কেউ কেউ জেলে যায়।
বিটেক-এর উত্থান:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চেলা-চামুন্ডাদের সঙ্গে নিয়ে লাইসেন্সহীনবিহীন ‘বিটেক’ নামে এমনই একটি হায় হায় কোম্পানি চালু করেছে গাজীপুরের চিহ্নিত প্রতারক সাইফুল ইসলাম। জয়দেবপুর রেল গেটের কলাপট্টি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ানি খেয়ে শিববাড়ি এলাকার আব্দুল করিম ভিলায় বিলাসবহুল অফিস থেকে প্রতারণার জাল বিছিয়েছে দেশজুড়ে।
প্রতারক সাইফুল ও তার চেলা-চামুন্ডারা সাধারণ মানুষদের কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে পিরামিড স্কিমের জালে ফাঁসিয়ে অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছে হয়েক হাজার কোটি টাকা।
অবৈধ এমএলএম ও নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিমে নতুন সদস্য সংগ্রহে বিপুল লাভের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারক সাইফুল ও তার চেলা-চামুন্ডারা প্রশাসনের চোখের সামনেই জেলার বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত সভা-সেমিনার আয়োজন করছে; এসব কার্যক্রমের ছবি ও ভিডিও আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে দেশজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করছে। এদের অধিকাংশই প্রকৃত ব্যবসা ছাড়াই সদস্য সংগ্রহকে মূল আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত:
বিটেকে বিনিয়োগকারীদের বেশিরভাগই পথে বসেছে। আবার অনেক বিনিয়োগকারী তাদের ‘বিটেক ক্লাব’ বিক্রি করে বিনিয়োগ তোলার জন্য হন্যে হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন:
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, অবৈধ এমএলএম ও নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম বিটেক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘বিকাশ’, ‘নগদ’ ও বিশেষকরে ‘উপায়’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতি মাসে শত কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করছে। এসব মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের বড় একটি অংশ বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নকল পরিচয়ে প্রতারণা:
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রতারক চক্রগুলো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম বা ব্র্যান্ডের সাথে মিল রেখে নিজেদের পরিচয় তৈরি করে আস্থা অর্জন করছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ‘উইথলোকালস’ পরিচয়ে পরিচালিত একটি চক্র ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে এবং জামালপুর থেকে চক্রের মূল হোতাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিশ্বব্যাপী এই ধরনের প্রতারণায় ব্র্যান্ড-ইমিটেশন, ভুয়া রেজিস্ট্রেশন, জাল লাইসেন্স এবং সাজানো “সাফল্যের গল্প” ব্যবহার করা হয়। তেমনি প্রতারক সাইফুলও একই কৌশল অনুসরণ করেছে। প্রতারক সাইফুলের ‘বিটেক’-ও সেই নিয়মে বিদেশি কোম্পানির নাম ধারণ করেছে।
শিল্পাঞ্চল টার্গেট: শ্রমিক-শিক্ষার্থী-গৃহিণী:
দেশজুড়ে শ্রমিক, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, শিক্ষার্থী এবং গৃহিণীরা প্রতারক সাইফুলের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। কারখানার গেট, মেস-বাড়ি, কোচিং সেন্টার, রেস্টুরেন্ট, কমিউনিটি সেন্টার করভেনশন সেন্টার, এমনকি সামাজিক অনুষ্ঠানেও “মোটিভেশনাল সেমিনার” আয়োজন করে সদস্য সংগ্রহ করছে প্রতারক সাইফুলের বিটেক।
প্রথমে স্বল্প টাকার বিনিয়োগের প্রলোভন —তারপর নতুন সদস্য আনলে কমিশন আর রেফারেল বোনাস— এভাবে গড়ে ওঠে চেইন। কয়েকজন প্রাথমিক সদস্য সামান্য লাভ পেলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশই মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একটি ‘ওয়েলথ ট্রান্সফার মেকানিজম’, যেখানে নিচের স্তরের বহু মানুষের অর্থ উপরের কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।
কীভাবে কাজ করে এই পিরামিড স্কিম:
পিরামিড স্কিম মূলত একটি ভঙ্গুর আর্থিক কাঠামো, যেখানে নতুন সদস্যদের বিনিয়োগ দিয়েই পুরোনো সদস্যদের লভ্যাংশ দেওয়া হয়। এখানে বাস্তব পণ্য বা সেবার কোনো টেকসই ভিত্তি থাকে না। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি ‘অস্থিতিশীল নিয়োগ-চালিত মডেল’— যেখানে সদস্য বৃদ্ধি থেমে গেলেই পুরো কাঠামো বা ব্যবসা ধসে পড়ে এবং অধিকাংশ বিনিয়োগকারী মূলধন হারান। আর কোম্পানির লোকেরা টাকা আত্মসাৎ করে ভেগে যায়।
বাংলাদেশে ২০১৩ সালের মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (কন্ট্রোল) অ্যাক্ট অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম পরিচালনা এবং পিরামিড স্কিম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন ভঙ্গ করলে তিন থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। প্রতারণা প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্বিগুণ অর্থ ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, লাখ লাখ মানুষের টাকা আত্মসাৎ করে ডেসটিনি একসময় পালিয়ে যায়। ওই ঘটনায় মামলাও হয়। কিন্তু একজন ভুক্তভোগীও টাকা ফেরত পায়নি।
‘মিস্ট্রাল এআই’ নামের আড়ালে আত্মসাৎ:
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ‘মিস্ট্রাল এআই’ পরিচয়ে পরিচালিত একটি চক্র কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলোচনায় আসে। ভুক্তভোগীদের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, “AI ট্রেডিং”, “ক্রিপ্টো ইনভেস্টমেন্ট”, “অটোমেটেড প্রফিট”—এমন প্রযুক্তিগত শব্দ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে, অথচ বাস্তবে কোনো কার্যকর ব্যবসা বা বিনিয়োগ কাঠামো ছিল না।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব:
গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ বা নাগরিক অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট থানা এবং ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের নির্দিষ্ট আইনগত দায়িত্ব রয়েছে।
থানার ক্ষেত্রে, আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য পাওয়া মাত্রই এফআইআর গ্রহণ, প্রাথমিক তদন্ত শুরু, অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনা, ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ এবং তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা বাধ্যতামূলক। সংবাদ প্রকাশিত হলেও পুলিশ সুয়োমোটো ভিত্তিতে মামলা নিতে পারে।
অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের দায়িত্ব হলো অভিযোগ গ্রহণ করে প্রাথমিক যাচাই, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানে নোটিশ প্রদান, শুনানি আয়োজন, প্রমাণ সাপেক্ষে জরিমানা আরোপ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। গুরুতর আর্থিক প্রতারণার ক্ষেত্রে তারা বিষয়টি পুলিশ, দুদক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থায় পাঠাতে বাধ্য।
গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ:
গাজীপুর নাগরিক কমিটির সভাপতি জুলীয়াস চৌধুরী আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, “পিরামিড স্কিম ও অবৈধ এমএলএম এখন সংগঠিত অর্থনৈতিক অপরাধে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন যদি প্রতিটি অভিযোগকে বাধ্যতামূলকভাবে এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করে, দ্রুত তদন্ত চালায়, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করে, সম্পদ জব্দের ব্যবস্থা নেয় এবং অবশ্যই দোষীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নেয় — তাহলে দেশ ও জাতি চক্র থেকে মুক্তি পাবে। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে নিয়মিত অভিযান, জরিমানা এবং প্রতারণাকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় এই অপরাধচক্র দেশের অর্থনীতি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করে নিয়ে যাবে।”
কেন ভয়াবহ?
নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম ও অবৈধ এমএলএম ব্যবসা বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করে। পরিবারগুলো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে, পারিবারিক অস্থিরতা বাড়ে এবং চরম ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঝুঁকিও তৈরি হয়। সঞ্চয় হারানোর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। একই সঙ্গে এই অবৈধ অর্থ লেনদেন অপরাধচক্রকে শক্তিশালী করে এবং মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়, ফলে প্রতারণার বিস্তার আরও দ্রুত হয়।
![]() |
| প্রতারক সাইফুল ইসলাম |
সাইফুলের বক্তব্য:
জানতে চাইলে পিরামিড স্কিম ও এমএলএম পদ্ধতির কথা অস্বাীকার করে বিটেক কমিউকেশন ওপিসির একমাত্র মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন আমার ব্যবসার সকল কাগজপত্র ঠিক আছে। তিনি বলেন, আমার এবং আমার ব্যবসার আয়কর ও ভ্যাট নিয়মিত পরিশোধ করা হয়।


COMMENTS