
এনএনবি
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও শেষ পর্যন্ত
নির্বাচনে অংশ নেবে কি না—সে বিষয়ে গভীর সংশয়ে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি
(এনসিপি)। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে আস্থাহীনতা, সমান সুযোগ না
পাওয়ার অভিযোগ এবং পক্ষপাতমূলক আচরণের আশঙ্কা থেকে ভোট বর্জনের চিন্তা করছে
দলটি।
এনসিপির মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব
ভূঁইয়া সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত
পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড.
মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য এনসিপি
প্রস্তুত।
দলীয় সূত্র জানায়, বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিএনপির প্রতি পক্ষপাতমূলক
আচরণের অভিযোগ তোলেন এনসিপির নেতারা। তাঁদের দাবি, দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি ও
আচরণবিধি লঙ্ঘনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ইসি স্পষ্টভাবে একটি দলের পক্ষে
অবস্থান নিয়েছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি ২০২৫) বিকেলে যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন
দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি
মনিরা শারমিন এবং আইনি সহায়তাবিষয়ক উপকমিটির প্রধান জহিরুল ইসলাম মূসা। বৈঠকে
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবও
উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে
এনসিপি সন্তুষ্ট নয়। তাঁর ভাষায়, ‘যে পরিবেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়ার
কথা, মাঠে আমরা তার প্রতিফলন দেখছি না। নির্বাচন যদি এভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়,
দায় শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপরই পড়বে।’
এনসিপির নেতারা মনে করেন, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ও ঘটনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন
একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা হারিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ,
সংবিধান ও আইন নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করে কমিশন এখতিয়ার অতিক্রম করছে।
চট্টগ্রামে এক বিএনপি প্রার্থীর বিপুল অঙ্কের ঋণখেলাপি থাকার পরও প্রার্থিতা
বৈধ ঘোষণাকে তারা এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
দলটির এক যুগ্ম সদস্যসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই ইসি
পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে এনসিপি। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ভোট বর্জনের
ঘোষণা আসতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
এনসিপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সেলের কো-লিড আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন,
গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হয়ে উঠেছে।
তাঁর মতে, কমিশন প্রকাশ্যেই একটি পক্ষের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।
দলটির অভিযোগ, এনসিপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ দেওয়া হলেও একই ধরনের
আচরণবিধি লঙ্ঘনে অন্য দলের প্রার্থীদের ছাড় দেওয়া হচ্ছে। আসিফ মাহমুদ বলেন,
এনসিপির প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে পক্ষপাতদুষ্টভাবে এবং
মিডিয়া ট্রায়ালের উদ্দেশ্যে।
দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে এনসিপি। তবে বিএনপির
বিতর্কিত প্রার্থীরা বহাল থাকলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাজপথে আন্দোলনের
পথেও যেতে পারে দলটি।
এ বিষয়ে মনিরা শারমিন বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক
সব পথ অনুসরণ করব। তবু ফল না এলে বিকল্প পথ ভাবতে হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে জানানো হয়, বৈঠকে এনসিপির উদ্বেগ শোনা হয়েছে।
প্রেস উইংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে লটারির মাধ্যমে মাঠ
প্রশাসনে রদবদল করা হয়েছে এবং এতে কোনো পক্ষপাতের সুযোগ নেই।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এ নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের নির্বাচন এবং তা
অবশ্যই সুষ্ঠু হতে হবে। নির্বাচনসংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ সরকারকে জানাতে
দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এনসিপি কেন্দ্রীয়ভাবে
‘ক্রাউড ফান্ডিং’ শুরু করেছে। রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে
সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন আসিফ মাহমুদ। তিনি জানান, দলের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ
প্রার্থী এই ব্যবস্থার আওতায় নির্বাচনী ব্যয় পরিচালনা করবেন, যাতে অর্থ
ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বজায় থাকে।
COMMENTS