
লেখা: ও'নীল ওসমান
কিছু গল্প থাকে, যেগুলো প্রথমে ব্যক্তিগত মনে হলেও ধীরে ধীরে সামাজিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। ধূমপান ছাড়ার গল্প সাধারণত স্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কতার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কখনও কখনও এমন একটি সিদ্ধান্ত শুধু শরীর নয়, মানুষের চিন্তা, আত্মবিশ্বাস এবং সৃজনশীলতার গতিপথও আমূল বদলে দেয়। জুলীয়াস চৌধুরীর গল্পটি ঠিক তেমনই— একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম নেওয়া এক বৃহত্তর জীবনবোধের গল্প।
জুলীয়াস চৌধুরী নিজেকে কখনোই ‘চেইন স্মোকার’ হিসেবে দেখতেন না। দিনে অল্প কয়েকটি সিগারেট, এদেশেরই অধিকাংশ ধূমপায়ীর চোখে যা তুচ্ছ অভ্যাস। কিন্তু ধীরে ধীরে এই অল্প ধূমপানই তার জীবনে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছিল। সভা-সমাবেশে, জনসমাগমে কিংবা পেশাগত আলোচনায় তার মনে হতো, শরীর থেকে ধোঁয়ার গন্ধ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। সেই গন্ধের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছিল এক ধরনের হীনম্মন্যতা, সামাজিক অস্বস্তি আর নিজের প্রতি এক অজানা বিরক্তি। বিষয়টি ছিল শারীরিক অস্বস্তির চেয়ে অনেক বেশি মানসিক।
নিজের বদঅভ্যাসে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে ২০২৪ সালের জুনে তিনি ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথ সহজ ছিল না, কিন্তু তা ছিল দৃঢ়। ধীরে ধীরে তিনি টের পেতে শুরু করেন ভেতরকার পরিবর্তন। ফিরে আসতে থাকে স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি। বহুদিন পর খাবারের প্রকৃত স্বাদ যেন নতুন করে ধরা দেয়। পরিচিত গন্ধগুলো আরও তীক্ষ্ণ ও জীবন্ত হয়ে ওঠে। এরপর আসে শারীরিক পরিবর্তন— ত্বকের উজ্জ্বলতা, চোখের নিচের ক্লান্তির ছাপ কমে যাওয়া, শরীরের ভারসাম্য ফিরে আসা। এই দৃশ্যমান পরিবর্তন অন্যরাও লক্ষ্য করতে শুরু করে।
কিন্তু সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তনটি ঘটেছিল ভেতরে। ধূমপানের সঙ্গে যে মানসিক কুয়াশা, অস্থিরতা আর আত্মগোপনের প্রবণতা ছিল, তা ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে। তার কথায়, মাথার ভেতর যেন আবার বাতাস চলাচল শুরু করে। চিন্তা পরিষ্কার হয়, মনোযোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়। সামাজিক মেলামেশায় যে অকারণ সংকোচ ছিল, তা অনেকটাই কমে আসে। তিনি নিজেকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন— একজন স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে।
এই মানসিক স্বচ্ছতাই তাকে নতুন পথ দেখিয়ে দেয়। সৃজনশীল মানুষদের ক্ষেত্রে যেমন হয়, ভেতরের জট খুললে বাইরের কাজেও তার প্রভাব পড়ে। জুলীয়াস চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ধূমপান ছাড়ার পর পাওয়া মানসিক স্থিতি ও ফোকাস তিনি ব্যয় করতে শুরু করেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাজে। জন্ম নেয় ‘সাহিত্য অমনিবাস’ নামের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সাহিত্য প্ল্যাটফর্ম। শুরু হয় ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য দিবস’-এর ভাবনা, যেখানে বিভিন্ন ভাষা, লেখা ও গল্পকে ঘিরে তৈরি হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী সংযোগ। পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে নিয়েছেন ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
একটু দূর থেকে এই উদ্যোগগুলোকে চাইলে আলাদা আলাদা প্রকল্প হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, এগুলোর পেছনে রয়েছে একটি অভিন্ন উৎস, যা হলো একজন মানুষের ভেতরের পরিবর্তন। ধূমপান ছাড়ার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু একটি ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ করেননি, তিনি নিজের সময়, শক্তি ও মনোযোগ নতুনভাবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করেছেন।
বাংলাদেশে ধূমপান এখনও ব্যাপকভাবে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। অনেকেই ভাবেন, “আমি তো বেশি খাই না,” “এতে এমন কী ক্ষতি?” কিন্তু জুলীয়াস চৌধুরীর অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, ধূমপানের ক্ষতি শুধু ফুসফুস বা হৃদ্যন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি আত্মবিশ্বাস কমায়, সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট করে, সৃজনশীল শক্তিকে ধীর করে দেয়। আমরা হয়ত তা টের পাই না, কারণ ধোঁয়ার আড়ালে সেই ক্ষয়টা নীরবে চলতে থাকে।
এই লেখার উদ্দেশ্য উপদেশমূলক নয়। এটি একজন মানুষের জীবন অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সুন্দর সম্ভাবনার কথা বলে। ধূমপান ছাড়ার পর জীবন যে শুধু ‘স্বাস্থ্যবান’ হয়, তা নয়, জীবন হতে পারে আরও পূর্ণ, আরও সজীব, আরও অর্থবহ। যারা এখনো দ্বিধায় আছেন, তাদের জন্য এই গল্পটি এক ধরনের প্রশ্ন ছুড়ে দেয়— আপনি কি শুধু সুস্থ থাকতে চান, নাকি পুরোপুরি বেঁচে থাকতে চান?
ধোঁয়া সরে গেলে যে দৃশ্যটা স্পষ্ট হয়, তা অনেক সময় আমাদের কল্পনার চেয়েও সুন্দর।
কিছু গল্প থাকে, যেগুলো প্রথমে ব্যক্তিগত মনে হলেও ধীরে ধীরে সামাজিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়। ধূমপান ছাড়ার গল্প সাধারণত স্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কতার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কখনও কখনও এমন একটি সিদ্ধান্ত শুধু শরীর নয়, মানুষের চিন্তা, আত্মবিশ্বাস এবং সৃজনশীলতার গতিপথও আমূল বদলে দেয়। জুলীয়াস চৌধুরীর গল্পটি ঠিক তেমনই— একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম নেওয়া এক বৃহত্তর জীবনবোধের গল্প।
জুলীয়াস চৌধুরী নিজেকে কখনোই ‘চেইন স্মোকার’ হিসেবে দেখতেন না। দিনে অল্প কয়েকটি সিগারেট, এদেশেরই অধিকাংশ ধূমপায়ীর চোখে যা তুচ্ছ অভ্যাস। কিন্তু ধীরে ধীরে এই অল্প ধূমপানই তার জীবনে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছিল। সভা-সমাবেশে, জনসমাগমে কিংবা পেশাগত আলোচনায় তার মনে হতো, শরীর থেকে ধোঁয়ার গন্ধ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। সেই গন্ধের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছিল এক ধরনের হীনম্মন্যতা, সামাজিক অস্বস্তি আর নিজের প্রতি এক অজানা বিরক্তি। বিষয়টি ছিল শারীরিক অস্বস্তির চেয়ে অনেক বেশি মানসিক।
নিজের বদঅভ্যাসে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে ২০২৪ সালের জুনে তিনি ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পথ সহজ ছিল না, কিন্তু তা ছিল দৃঢ়। ধীরে ধীরে তিনি টের পেতে শুরু করেন ভেতরকার পরিবর্তন। ফিরে আসতে থাকে স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি। বহুদিন পর খাবারের প্রকৃত স্বাদ যেন নতুন করে ধরা দেয়। পরিচিত গন্ধগুলো আরও তীক্ষ্ণ ও জীবন্ত হয়ে ওঠে। এরপর আসে শারীরিক পরিবর্তন— ত্বকের উজ্জ্বলতা, চোখের নিচের ক্লান্তির ছাপ কমে যাওয়া, শরীরের ভারসাম্য ফিরে আসা। এই দৃশ্যমান পরিবর্তন অন্যরাও লক্ষ্য করতে শুরু করে।
কিন্তু সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তনটি ঘটেছিল ভেতরে। ধূমপানের সঙ্গে যে মানসিক কুয়াশা, অস্থিরতা আর আত্মগোপনের প্রবণতা ছিল, তা ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে। তার কথায়, মাথার ভেতর যেন আবার বাতাস চলাচল শুরু করে। চিন্তা পরিষ্কার হয়, মনোযোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়। সামাজিক মেলামেশায় যে অকারণ সংকোচ ছিল, তা অনেকটাই কমে আসে। তিনি নিজেকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন— একজন স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে।
এই মানসিক স্বচ্ছতাই তাকে নতুন পথ দেখিয়ে দেয়। সৃজনশীল মানুষদের ক্ষেত্রে যেমন হয়, ভেতরের জট খুললে বাইরের কাজেও তার প্রভাব পড়ে। জুলীয়াস চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ধূমপান ছাড়ার পর পাওয়া মানসিক স্থিতি ও ফোকাস তিনি ব্যয় করতে শুরু করেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাজে। জন্ম নেয় ‘সাহিত্য অমনিবাস’ নামের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সাহিত্য প্ল্যাটফর্ম। শুরু হয় ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য দিবস’-এর ভাবনা, যেখানে বিভিন্ন ভাষা, লেখা ও গল্পকে ঘিরে তৈরি হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী সংযোগ। পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে নিয়েছেন ‘বাংলা ভাষা দিবস’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
একটু দূর থেকে এই উদ্যোগগুলোকে চাইলে আলাদা আলাদা প্রকল্প হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, এগুলোর পেছনে রয়েছে একটি অভিন্ন উৎস, যা হলো একজন মানুষের ভেতরের পরিবর্তন। ধূমপান ছাড়ার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু একটি ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ করেননি, তিনি নিজের সময়, শক্তি ও মনোযোগ নতুনভাবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করেছেন।
বাংলাদেশে ধূমপান এখনও ব্যাপকভাবে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য। অনেকেই ভাবেন, “আমি তো বেশি খাই না,” “এতে এমন কী ক্ষতি?” কিন্তু জুলীয়াস চৌধুরীর অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, ধূমপানের ক্ষতি শুধু ফুসফুস বা হৃদ্যন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি আত্মবিশ্বাস কমায়, সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট করে, সৃজনশীল শক্তিকে ধীর করে দেয়। আমরা হয়ত তা টের পাই না, কারণ ধোঁয়ার আড়ালে সেই ক্ষয়টা নীরবে চলতে থাকে।
এই লেখার উদ্দেশ্য উপদেশমূলক নয়। এটি একজন মানুষের জীবন অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সুন্দর সম্ভাবনার কথা বলে। ধূমপান ছাড়ার পর জীবন যে শুধু ‘স্বাস্থ্যবান’ হয়, তা নয়, জীবন হতে পারে আরও পূর্ণ, আরও সজীব, আরও অর্থবহ। যারা এখনো দ্বিধায় আছেন, তাদের জন্য এই গল্পটি এক ধরনের প্রশ্ন ছুড়ে দেয়— আপনি কি শুধু সুস্থ থাকতে চান, নাকি পুরোপুরি বেঁচে থাকতে চান?
ধোঁয়া সরে গেলে যে দৃশ্যটা স্পষ্ট হয়, তা অনেক সময় আমাদের কল্পনার চেয়েও সুন্দর।
COMMENTS