
জুলীয়াস চৌধুরী
বাণিজ্যিকভাবে বৃহৎ পরিসরে মুরগি পালনের বিস্তার শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়াচ্ছে না, এর সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে রোগজীবাণুর বিস্তার ও বিবর্তনের পরিবেশও। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্পভিত্তিক পোলট্রি উৎপাদনের ব্যাপক সম্প্রসারণ বন্য পাখি ও খামারের মুরগির মধ্যে ক্যামপাইলোব্যাক্টার ব্যাকটেরিয়ার বিভিন্ন ধরন বা স্ট্রেইনের আদান-প্রদান ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষকদের হিসাবে, এই আদান-প্রদানের হার আগের তুলনায় ১০০ গুণেরও বেশি বেড়েছে।
গবেষণাটি ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। ‘অ্যাক্সেলারেটিং ক্যামপাইলোব্যাক্টার জুনোসিস ইন দ্য অ্যানথ্রোপোসিন’ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনিওস অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রিসার্চের গবেষকেরা।
গবেষণায় ১৯৭৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩০টি দেশের মুরগি ও বন্য পাখি থেকে সংগৃহীত প্রায় ২ হাজার ৮০০ ক্যামপাইলোব্যাক্টার ব্যাকটেরিয়ার জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকেরা ব্যাকটেরিয়াটির বিস্তার, বিভিন্ন পাখির মধ্যে সংক্রমণ এবং সময়ের সঙ্গে এর জিনগত পরিবর্তনের চিত্র বোঝার চেষ্টা করেছেন।
ক্যামপাইলোব্যাক্টার বিশ্বজুড়ে ব্যাকটেরিয়াজনিত ডায়রিয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি জীবাণু। সাধারণত দূষিত বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা মাংসের মাধ্যমে মানুষ এই ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মুরগির মাংস সংক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে পরিচিত।
এই ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে সাধারণত ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, জ্বর, বমি বমি ভাব এবং কখনো বমির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ মানুষ কয়েক দিনের মধ্যে চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল মানুষের ক্ষেত্রে সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে রক্তে সংক্রমণ বা অন্যান্য জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
অক্সফোর্ডের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুরগির সংখ্যা এবং শিল্পভিত্তিক পোলট্রি উৎপাদন ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যামপাইলোব্যাক্টার ব্যাকটেরিয়ার জন্য নতুন ও বড় একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মুরগিকে অপেক্ষাকৃত ঘন পরিবেশে পালনের ফলে বিভিন্ন উৎস থেকে আসা ব্যাকটেরিয়ার একই পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া ও টিকে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি ব্যাকটেরিয়ার বিভিন্ন ধরনের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া এবং জিনগত বৈশিষ্ট্য বিনিময়ের সুযোগ বাড়াতে পারে। এর ফলে কিছু ব্যাকটেরিয়া নতুন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আগে যেসব ক্যামপাইলোব্যাক্টার ব্যাকটেরিয়ার ধরন প্রধানত নির্দিষ্ট কিছু বন্য পাখির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, মুরগির সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সেগুলোর খামারের মুরগির মধ্যে প্রবেশের সুযোগও বেড়েছে। অর্থাৎ বন্য পাখি, খামারের মুরগি এবং মানুষের খাদ্যব্যবস্থার মধ্যে জীবাণুর চলাচলের একটি বিস্তৃত পথ তৈরি হচ্ছে।
গবেষকেরা ব্যাকটেরিয়ার জিনগত বিশ্লেষণ করে মুরগির পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার কিছু পরিবর্তনেরও সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর অর্থ হলো, নিবিড় পোলট্রি উৎপাদনব্যবস্থা এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়ার বিকাশ ও বিস্তারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জনস্বাস্থ্যের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো রোগজীবাণু অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করলে সেই জীবাণুর সংক্রমণের চিকিৎসা কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ কারণে শুধু রোগীর চিকিৎসা নয়, প্রাণিসম্পদ খাতেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
গবেষণার প্রধান লেখকদের একজন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ওকেম কাইন মনে করেন, পোলট্রি পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময় ক্যামপাইলোব্যাক্টার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে, যা প্রতিকূল পরিবেশে ব্যাকটেরিয়াটির টিকে থাকার ক্ষমতা বাড়ায়। এর মধ্যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্যও থাকতে পারে।
যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতিও ক্যামপাইলোব্যাক্টার সংক্রমণের গুরুত্ব বোঝায়। দেশটির সরকারি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে ২০২৫ সালে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ক্যামপাইলোব্যাক্টার সংক্রমণের ৬৯ হাজার ৩৯৪টি ঘটনা শনাক্ত হয়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৩৯২। ২০১৬ সালে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ৭৯।
তবে এসব সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত আক্রান্তের মোট সংখ্যা বোঝা যায় না। কারণ ক্যামপাইলোব্যাক্টারে আক্রান্ত অনেক মানুষ চিকিৎসকের কাছে যান না অথবা তাদের নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয় না। ফলে সরকারি হিসাবে শনাক্ত রোগীর তুলনায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইংল্যান্ডের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও ক্যামপাইলোব্যাক্টার ছিল দেশটির সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট হওয়া ব্যাকটেরিয়াজনিত পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণগুলোর একটি। ওই বছর খাদ্যবাহিত ক্যামপাইলোব্যাক্টার সংক্রমণের সাতটি প্রাদুর্ভাব জাতীয় নজরদারিতে রিপোর্ট করা হয়। এর মধ্যে দুটি মুরগি অথবা মুরগিজাত খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
তবে নতুন অক্সফোর্ড গবেষণার সঙ্গে ক্যানসারের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত করা ঠিক হবে না। ক্যামপাইলোব্যাক্টার সংক্রমণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে পৃথক গবেষণা রয়েছে। আবার ক্যামপাইলোব্যাক্টারের কিছু প্রজাতি থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত পদার্থের ক্যানসারের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে। কিন্তু অক্সফোর্ডের নতুন গবেষণার প্রধান বিষয় ক্যানসার নয়। গবেষণাটির মূল লক্ষ্য ছিল শিল্পভিত্তিক পোলট্রি উৎপাদন কীভাবে ক্যামপাইলোব্যাক্টারের বিস্তার, বিভিন্ন পাখির মধ্যে সংক্রমণ এবং ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তনকে প্রভাবিত করছে, তা বোঝা।
গবেষণাটি আরও একটি বড় বিষয় সামনে এনেছে। মানুষের তৈরি পরিবেশগত পরিবর্তন শুধু জলবায়ু বা জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব ফেলে না, রোগজীবাণুর বিস্তার ও বিবর্তনের ওপরও এর প্রভাব থাকতে পারে। বিশেষ করে নিবিড় প্রাণিসম্পদ উৎপাদনব্যবস্থা বিভিন্ন প্রাণীর বিপুলসংখ্যক সদস্যকে একই পরিবেশে রাখার কারণে রোগজীবাণুর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এ কারণে রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে প্রাণিসম্পদ উৎপাদন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ এবং খাদ্যশৃঙ্খলকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। এই ধারণাকে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করেন।
খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছে। কাঁচা মুরগির মাংস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়া করার সময় ব্যাকটেরিয়া হাত, ছুরি, কাটিং বোর্ড এবং রান্নাঘরের অন্যান্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে এসব জীবাণু অন্য খাবারে পৌঁছালে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই কাঁচা মাংস ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, কাঁচা মাংস ধরার পর হাত ও রান্নার সরঞ্জাম ভালোভাবে পরিষ্কার করা এবং মুরগির মাংস যথেষ্ট তাপমাত্রায় ভালোভাবে রান্না করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অর্ধসিদ্ধ মুরগির মাংস খাওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে চলা উচিত।
তবে এই গবেষণাকে মুরগির মাংস খাওয়া বন্ধ করার পরামর্শ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণাটির মূল বার্তা হলো, বিশ্বজুড়ে মুরগির উৎপাদন দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত রোগজীবাণুর ঝুঁকিও নতুনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
খামারে জৈবনিরাপত্তা জোরদার করা, বন্য পাখি ও খামারের মুরগির অনিয়ন্ত্রিত সংস্পর্শ কমানো, অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং আধুনিক জিনগত পদ্ধতিতে রোগজীবাণুর ওপর নজরদারি বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিশ্বে মুরগির মাংসের চাহিদা ও উৎপাদন আরও বাড়ার সম্ভাবনার মধ্যে অক্সফোর্ডের এই গবেষণা তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কীভাবে এমন একটি কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যেখানে রোগজীবাণুর বিস্তার এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির ঝুঁকি কম থাকবে, ভবিষ্যতের জনস্বাস্থ্য নীতিতে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে ক্যামপাইলোব্যাক্টারের জাতীয় পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য নজরদারি তথ্য সীমিত হলেও বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের ডায়রিয়া রোগী, পোলট্রি খামার, মুরগির মাংস এবং প্রস্তুত খাবারে জীবাণুটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সংগৃহীত ক্যামপাইলোব্যাক্টারের মধ্যে উচ্চমাত্রার বহুঔষধ-প্রতিরোধও শনাক্ত হয়েছে।
সূত্র:
১. অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা সংক্রান্ত প্রতিবেদন
২. ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’, অক্সফোর্ড গবেষণা, ২০২৬
৩. আইনিওস অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রিসার্চ
৪. সেন্ট অ্যান’স কলেজ, অক্সফোর্ড
৫. যুক্তরাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগ
৬. যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থা
COMMENTS