সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের লাল বিজ্ঞপ্তি জারি এবং পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাকে গ্রেফতারের খবর প্রকাশ্যে আসার পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থা ইন্টারপোল। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইন্টারপোলের অনুসন্ধিত তালিকায় ৬০ জন বাংলাদেশির নাম রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রকাশ্য লাল বিজ্ঞপ্তির তালিকায় রয়েছে ৬ হাজার ৪০০-এর বেশি পলাতক ব্যক্তির তথ্য।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ইন্টারপোলের নিজস্ব নীতিমালা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাস্তবে লাল বিজ্ঞপ্তিভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রকাশ্য তালিকার চেয়ে অনেক বেশি। ইন্টারপোলের অধিকাংশ লাল বিজ্ঞপ্তি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং সেগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না। শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট দেশের অনুরোধে কিংবা কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে জনসাধারণের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে লাল বিজ্ঞপ্তির একটি অংশ প্রকাশ করা হয়।
ইন্টারপোলের ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে লাল বিজ্ঞপ্তি জারি হলেও তার নাম প্রকাশ্য অনুসন্ধিত তালিকায় প্রদর্শিত হয়নি। আন্তর্জাতিক পুলিশি সহযোগিতা বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে পলাতক ব্যক্তিকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ না দিতেই লাল বিজ্ঞপ্তি গোপন রাখা হয়। কারণ, কোনো ব্যক্তি যদি জানেন যে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান চলছে, তাহলে তিনি চলাফেরা সীমিত করতে পারেন কিংবা আত্মগোপনের আরও কার্যকর উপায় খুঁজে নিতে পারেন।
বর্তমানে প্রকাশিত ৬০ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মানব পাচার, মুদ্রা জালিয়াতি, অস্ত্র অপরাধ, প্রতারণা, যৌন নির্যাতন, অর্থ আত্মসাৎ এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা তাদের খুঁজছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইসওয়াতিনি ও বেলজিয়াম।
বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর চাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন চাঁদপুর সদরের রাজু ঢালী, যাকে হত্যা মামলায় খুঁজছে সিঙ্গাপুর। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিবেশী দেশ ইসওয়াতিনি হত্যা মামলায় খুঁজছে ঢাকার মো. মিলনকে এবং হত্যা চেষ্টার মামলায় খুঁজছে লিটন ব্যাপারীকে। নোয়াখালীর মিজান মিয়াকে খুঁজছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ভারতের অনুসন্ধান তালিকায় রয়েছেন মুদ্রা জালিয়াতির অভিযোগে খুলনার আজিজুর রহমান, অজয় বিশ্বাস ও তরিকুল ইসলাম, নোয়াখালীর সবুজ, গোপালগঞ্জের আব্দুল আলীম শরীফ, নারায়ণগঞ্জের মনির ভূঁইয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শফিকুল ইসলাম এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের মামলায় অভিযুক্ত আলহাজ মো. শফিকুল ইসলাম। খুনের অভিযোগে লক্ষ্মীপুরের খোরশেদ আলমকে খুঁজছে বেলজিয়াম। চোরাচালানের অভিযোগে নাটোরের সিরাজ মোস্তফা এবং হত্যা মামলায় ফেনীর আলাউদ্দিনকে খুঁজছে মালয়েশিয়া। মালদ্বীপ খুঁজছে অর্থ তছরুপের অভিযোগে অভিযুক্ত হানিফকে। অন্যদিকে, যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধে জাহিদুল ইসলাম এবং অস্ত্র মামলায় ফজলুল আমীন জাভেদকে খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ যাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি হত্যা মামলার আসামি। এ তালিকায় রয়েছেন বাগেরহাটের রবিউল ইসলাম, টাঙ্গাইলের মোহাম্মদ তাজউদ্দীন ও বাবু আহমেদ রাতুল, চট্টগ্রামের ইউসুফ ও সাজ্জাদ হোসেন খান, ফরিদপুরের নাইম খান ইকরাম, বগুড়ার কালা জাহাঙ্গীর ফেরদৌস, গাজীপুরের নুরুল দীপু ও আহাম্মেদ মজনু, কুমিল্লার খন্দকার আব্দুর রশীদ ও রাশেদ চৌধুরী, ঢাকার নুর চৌধুরী, নবী হোসাইন, জিসান আহমেদ, তৌফিক আলম, প্রকাশ কুমার, জাফর আহমেদ, সালাউদ্দিন মিন্টু, নাজমুল আনসার ও শরীফুল হক ডালিম, খুলনার শরীফুল হোসাইন, চট্টগ্রামের আমিনুর রসুল, নেত্রকোনার আব্দুল জাব্বার, বরিশালের গোলাম ফারুক অভি, মুন্সীগঞ্জের রফিকুল ইসলাম, খুলনার হারুন শেখ, নরসিংদীর মোসলেম উদ্দিন খান এবং গাইবান্ধার চন্দন কুমার রায়।
এছাড়া মানব পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং মুক্তিপণের দাবিতে হত্যার অভিযোগে কিশোরগঞ্জের জাফর ইকবাল, স্বপন, মিন্টু মিয়া ও তানজীরুল এবং মাদারীপুরের মোল্লা নজরুল ইসলামকে খুঁজছে বাংলাদেশ। পর্নোগ্রাফি আইনের মামলায় টাঙ্গাইলের ওয়াসিম, অস্ত্র মামলায় গিয়াস উদ্দিন, নির্যাতনের মামলায় চট্টগ্রামের অশোক কুমার দাশ এবং জালিয়াতির অভিযোগে জামালপুরের আমানুল্লাহ শফিক ও আতাউর রহমানও রয়েছেন অনুসন্ধিত তালিকায়।
এ ছাড়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত জাহিদ হোসেন খোকন, সৈয়দ মো. হাছান আলী, আবুল কালাম আজাদ এবং সৈয়দ মো. হোসেনের বিরুদ্ধেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারপোল বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশনের সদস্য বর্তমানে বিশ্বের ১৯৬টি দেশ। সংস্থাটি নিজে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে না এবং লাল বিজ্ঞপ্তিও আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা নয়। বরং এটি সদস্য দেশগুলোর পুলিশ ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময়, পলাতক আসামিকে শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী লাল বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

COMMENTS