![]() |
| ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জব্দ করা কোকেন (ফাইল ছবি) |
জুলীয়াস চৌধুরী
আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রগুলো ক্রমেই তাদের কৌশল বদলাচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকায় রেকর্ড পরিমাণ কোকেন উৎপাদনের পর নতুন বাজার ও নিরাপদ পাচারপথের খোঁজে তারা এখন দক্ষিণ এশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। আর সেই কৌশলগত রুটে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের অধীন ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ড (আইএনসিবি) সতর্ক করে বলেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র বাংলাদেশকে কোকেন পাচারের একটি 'ট্রানজিট হাব' হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে দেশটি ধীরে ধীরে সম্ভাব্য ভোক্তা বাজারেও পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত আইএনসিবির বৈশ্বিক মাদক পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক উৎপাদন ও পাচারের ধরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায় কোকেন উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর পাচারকারীরা প্রচলিত রুটের পাশাপাশি নতুন গন্তব্য খুঁজতে শুরু করেছে। সেই তালিকায় দক্ষিণ এশিয়া এখন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকায় উৎপাদিত কোকেন প্রথমে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা আকাশপথে বাংলাদেশে কোকেন নিয়ে আসে। এখান থেকে চালানের একটি অংশ ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপে পাচার করা হয়। ফলে বাংলাদেশ কেবল একটি ট্রানজিট পয়েন্টই নয়, আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলেও পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দক্ষিণ এশিয়া এখন শুধু মাদক পরিবহনের করিডর নয়; ধীরে ধীরে এটি কোকেনের নতুন ভোক্তা বাজারেও রূপ নিচ্ছে। সেই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশেও কোকেনের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়তে পারে।
আইএনসিবির প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্যের সঙ্গে দেশের বাস্তব পরিস্থিতির মিল পাওয়া গেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণেও। অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত চার বছরে দেশে অন্তত ১০টি বড় কোকেনের চালান জব্দ করা হয়েছে।
ডিএনসির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্র বাংলাদেশকে কোকেন পরিবহনের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এ পর্যন্ত মালাউই, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া ও ক্যামেরুনের কয়েকজন নাগরিক বাংলাদেশে কোকেন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তারা সবাই আকাশপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন এবং তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ হয়ে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে কোকেন পৌঁছে দেওয়া।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩০ কেজি কোকেন জব্দ করা হলেও ২০২৫ সালে জব্দের পরিমাণ নেমে এসেছে ১৪ দশমিক ৬৫১ কেজিতে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জব্দের পরিমাণ কমে যাওয়া মানেই পাচার কমে গেছে—এমনটি বলা যাবে না। বরং পাচারকারীরা আরও গোপন ও প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল গ্রহণ করছে।
২০২৫ সালে ডিএনসির কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো কোকেনের সাতটি নমুনার সবগুলোতেই কোকেনের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
ইয়াবা ও সিনথেটিক মাদকের বিস্তার
আইএনসিবির প্রতিবেদনে শুধু কোকেন নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা ও অন্যান্য সিনথেটিক মাদকের প্রবাহ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের শান ও কাচিন রাজ্যে বিপুল পরিমাণ মেথামফেটামিন উৎপাদিত হচ্ছে। এসব মাদক প্রথমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পৌঁছায়। পরে আসাম, মিজোরাম, মণিপুর, ত্রিপুরা ও মেঘালয় সীমান্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
অন্যদিকে ডিএনসির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে নাফ নদী, টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, উখিয়া, সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকা দিয়ে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে।
নতুন মাদকের উদ্বেগজনক বিস্তার
প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে দ্রুত বিস্তার ঘটছে নতুন ধরনের সিনথেটিক বা কৃত্রিম রাসায়নিক মাদকেরও। ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে অন্তত ১৩ ধরনের নতুন বা অপ্রচলিত মাদক শনাক্ত ও জব্দ করা হয়েছে।ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে নতুন ধরনের মাদক শনাক্ত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব মাদকের অধিকাংশই রাসায়নিকভাবে তৈরি এবং প্রচলিত মাদকের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
ভৌগোলিক অবস্থানেই বড় ঝুঁকি
মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।ডিএনসি বলছে, বিশ্বের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাদক উৎপাদন ও পাচার অঞ্চল—গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং গোল্ডেন ওয়েজ—এই তিনটির মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড নিয়ে গঠিত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত। পশ্চিমে রয়েছে আফগানিস্তান, ইরান ও পাকিস্তান নিয়ে গঠিত গোল্ডেন ক্রিসেন্ট, যা দীর্ঘদিন ধরে আফিম ও হেরোইন উৎপাদনের জন্য পরিচিত। আর উত্তরে ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের অংশজুড়ে বিস্তৃত গোল্ডেন ওয়েজ অঞ্চল। এই তিনটি অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থান করায় আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারীদের কাছে বাংলাদেশ ক্রমেই কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর পাচারের নতুন চ্যালেঞ্জ
ডিএনসির মহাপরিচালক জানিয়েছেন, যেসব দেশ থেকে মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া হচ্ছে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।তিনি বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক ব্যবসা পরিচালনার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাইবার নজরদারি জোরদার এবং আইনগত ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
এদিকে মাদকসংক্রান্ত অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইন আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে শুক্রবার (২৬ জুন) সরকারিভাবে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—"বিশ্বে মাদক সমস্যা: বিদ্যমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী পদক্ষেপ"।
আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কবার্তা এবং দেশের গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণ একই বার্তা দিচ্ছে—বাংলাদেশ এখন শুধু মাদকের ট্রানজিট রুট নয়, বরং আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের কৌশলগত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

COMMENTS