$type=ticker$c=12$cls=0$b=0

ঐতিহ্যের পণ্য থেকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ উদ্যোগে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি

One Village One Product

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট (ওভিওপি)’ উদ্যোগে স্থানীয় ঐতিহ্য, সৃজনশীল অর্থনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থায়ন ও বৈশ্বিক বাজারকে একই কাঠামোয় আনার পরিকল্পনা; বিশেষজ্ঞদের মতে, সফল বাস্তবায়ন হলে এটি দেশের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নতুন শিল্পবিপ্লবের সূচনা করতে পারে।


জুলীয়াস চৌধুরী

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল অষ্টগ্রামের পনির শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি প্রায় তিন শতকের ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই কৌশলে তৈরি হওয়া এই দুগ্ধজাত পণ্য স্বাদ, গুণগত মান ও স্বাতন্ত্র্যের কারণে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পরিচিতি পেয়েছে। অথচ পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বাজারব্যবস্থা এবং রপ্তানির সুযোগ না থাকায় অষ্টগ্রামের পনির আজও শিল্পে পরিণত হতে পারেনি। একই চিত্র দেখা যায় দেশের অসংখ্য গ্রামে- কোথাও তাঁতের শাড়ি, কোথাও মৃৎশিল্প, কোথাও শীতলপাটি, আবার কোথাও বাঁশ, কাঠ বা ধাতব কারুশিল্প। শত বছরের ঐতিহ্য ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ স্থানীয় শিল্প আজও সীমাবদ্ধ রয়েছে ছোট পরিসরের উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; বরং মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পণ্য। এই সম্ভাবনাকে আধুনিক প্রযুক্তি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে দেশের রপ্তানি আয়ের নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক হাতে নিয়েছে উচ্চাভিলাষী ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট (ওভিওপি)’ কর্মসূচি। নীতিনির্ধারক, ব্যাংকার ও শিল্পবিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতকেই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোকেও নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করছে। প্রথমবারের মতো ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতিকে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, স্থানীয় ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নকশা, কারুশিল্প কিংবা অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ পণ্যকে আর শুধু সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে নয়, বরং উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কার্যকর অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এ ধারণার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে দেশের কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পখাত।

বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে এমএসএমই খাতই কর্মসংস্থান সৃষ্টির সবচেয়ে বড় উৎস। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। শিল্প মন্ত্রণালয় ও এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণের বাইরে রয়ে গেছেন। ট্রেড লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), ভ্যাট নিবন্ধন, হিসাবরক্ষণ এবং পর্যাপ্ত জামানতের অভাবে অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে তাদের অনেকেই উচ্চ সুদের অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যও এ খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ- দুই দিকই স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অথচ ২০২২–২৩ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। মাঝের দুই অর্থবছরেও প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থায়নের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যা, বাজারসংযোগের সীমাবদ্ধতা এবং প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া- এসব কারণেই এ খাত প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, কেবল ঋণ বিতরণ বাড়ালেই হবে না; বরং উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিপণন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং রপ্তানিকে একই মূল্যশৃঙ্খলের আওতায় আনতে হবে। অর্থাৎ, একজন উৎপাদক থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকারী, পরিবহনকারী, পাইকার, রপ্তানিকারক এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা- সবাইকে একই অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ওভিওপি উদ্যোগের মূল দর্শনও এখানেই।

বাংলাদেশে অঞ্চলভিত্তিক পণ্য উন্নয়নের ধারণা অবশ্য নতুন নয়। ২০০৮ সালে সরকার ‘এক জেলা এক পণ্য (ওডিওপি)’ কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং ২০০৯ সালে এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয় রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে (ইপিবি)। সে সময় সুগন্ধি চাল, আগর, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন জেলার মোট ১৪টি সম্ভাবনাময় পণ্য নির্বাচন করা হয়েছিল। কিন্তু সমন্বিত অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, বাজারসংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কর্মসূচিটি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ফলে উদ্যোগটি মূলত নির্বাচিত কয়েকটি পণ্যের সম্ভাবনা যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ওভিওপি পরিকল্পনায় সেই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হয়েছে। এবার শুধু একটি পণ্য নির্বাচন করাই লক্ষ্য নয়; বরং পণ্যকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প-ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। উৎপাদক থেকে শুরু করে ব্যাংক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, লজিস্টিকস সেবা, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা- সব পক্ষকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে এতে। নীতিনির্ধারকদের ভাষায়, এটি কোনো একক ঋণ প্রকল্প নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক রূপান্তর কর্মসূচি।

এই উদ্যোগের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। সম্প্রতি এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের প্রতিটি অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও বিখ্যাত পণ্যকে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কুটির শিল্প ও এসএমই খাতের বিকাশে সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। একই ধরনের অঙ্গীকার রয়েছে বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারেও, যেখানে অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে কেন্দ্র করে কুটির শিল্পের বিকাশ, স্বল্পসুদে অর্থায়ন, বৈশ্বিক ই-কমার্সে প্রবেশ এবং ব্যবসাবান্ধব ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অঞ্চলভিত্তিক পণ্য উন্নয়নের এ ধারণা ইতোমধ্যেই সফলতার নজির সৃষ্টি করেছে। ১৯৭৯ সালে জাপানের ওইতা প্রিফেকচারে গভর্নর মরিহিকো হিরামাৎসু গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ আন্দোলনের সূচনা করেন। পরে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এই মডেলকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেয়। থাইল্যান্ডের ওয়ান ট্যাম্বন ওয়ান প্রোডাক্ট (ওটিওপি) কর্মসূচি, জাপানের আঞ্চলিক ব্র্যান্ডিং এবং বিভিন্ন দেশের ক্লাস্টারভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন কর্মসূচি দেখিয়েছে- সঠিক নীতি, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে একটি ছোট গ্রামের পণ্যও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওভিওপি পরিকল্পনাও সেই অভিজ্ঞতার আলোকে সাজানো হয়েছে। তবে এই কর্মসূচির বিশেষত্ব হলো, এখানে শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল পরিচয়, ক্যাশ-ফ্লোভিত্তিক ঋণ, কিউআর কোডভিত্তিক ট্রেসেবিলিটি, ভ্যালু চেইন ফাইন্যান্সিং এবং কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস- সবকিছুকে একই নীতিগত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ওভিওপি (ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট) কর্মসূচিকে বাস্তব রূপ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু একটি ঋণ প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং উৎপাদন, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, বাজারব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুশাসন- এই ছয়টি খাতকে একত্রে সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের ভাষায়, এটি হবে গ্রামীণ অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সমন্বিত ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্পায়ন কর্মসূচি।

এরই অংশ হিসেবে দেশের ৫২টি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) তহবিল গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো স্বল্পসুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ দেবে, আর বাংলাদেশ ব্যাংক সেই অর্থের বড় অংশ পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে সরবরাহ করবে। ফলে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থের জোগান যেমন সহজ হবে, তেমনি ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে কমে আসবে।

নীতিপত্র অনুযায়ী, আগামী তিন বছরে এই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক কোটিরও বেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কারিগর, কৃষক ও উৎপাদককে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বাড়ানোরও পরিকল্পনা রয়েছে।


জামানত নয়, গুরুত্ব পাবে ব্যবসার সক্ষমতা

ওভিওপি কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী দিক হচ্ছে ঋণ বিতরণের প্রচলিত ধারণায় মৌলিক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংক ঋণ দিতে গিয়ে স্থাবর সম্পত্তি বা অন্যান্য জামানতের ওপর নির্ভর করে। ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তা হওয়া সত্ত্বেও বহু ক্ষুদ্র উৎপাদক অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন।

নতুন মডেলে সেই কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে মূল্য শৃঙ্খল অর্থায়ন (Value Chain Financing) চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু একজন উদ্যোক্তা নয়, একটি পণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত পুরো শৃঙ্খলকে অর্থায়নের আওতায় আনা হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অষ্টগ্রামের পনির উৎপাদনের ক্ষেত্রে শুধু দুগ্ধখামারিকে নয়; দুধ সংগ্রহকারী, পনির প্রস্তুতকারী, প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান, কোল্ড চেইন অপারেটর, পরিবহনকারী এবং রপ্তানিকারক- প্রত্যেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। এতে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ শক্তিশালী হবে এবং একটি অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমও গতিশীল হয়ে উঠবে।

 

সাতটি নীতিগত স্তম্ভের ওপর দাঁড়াবে পুরো কর্মসূচি

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাস্তবায়ন কমিটি ওভিওপি কর্মসূচিকে সাতটি প্রধান নীতিগত স্তম্ভ বা পলিসি পিলারের ওপর সাজিয়েছে।

প্রথম স্তম্ভ হচ্ছে সঠিক পণ্য ও অর্থনৈতিক ক্লাস্টার নির্বাচন। অতীতে অঞ্চলভিত্তিক পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যকে প্রধান বিবেচনা করা হলেও এবার বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাজারে চাহিদা, মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনা, রপ্তানিযোগ্যতা, উৎপাদনের সক্ষমতা, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং কাঁচামালের সহজলভ্যতার ভিত্তিতে প্রতিটি পণ্য মূল্যায়ন করা হবে।

এ জন্য একটি ডিজিটাল স্কোরিং মডেল তৈরি করা হবে, যেখানে বাজারের চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মূল্য সংযোজন, রপ্তানির সম্ভাবনা, উৎপাদন সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি ক্লাস্টারের মূল্যায়ন সম্পন্ন হবে। পরবর্তীতে নির্বাচিত প্রতিটি ক্লাস্টারের জন্য একটি জাতীয় ডিজিটাল ক্লাস্টার ম্যাপ এবং স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচিতি তৈরি করা হবে।

দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ভ্যালু চেইন ইন্টিগ্রেশন।

নীতিনির্ধারকদের মতে, শুধু পণ্য উৎপাদন করলেই হবে না; সেই পণ্যকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, উন্নত প্যাকেজিং এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা।

এ পরিকল্পনার আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি অর্থনৈতিক ক্লাস্টারকে ধীরে ধীরে একটি 'মিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোসিস্টেম' হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

যেমন- রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ কিংবা রংপুর অঞ্চলের আমচাষিদের সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত করে কাঁচা আমের পাশাপাশি আমের পাল্প, জুস, ড্রাই ম্যাঙ্গো, জ্যাম বা অন্যান্য মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। একইভাবে কুমিল্লার খাদি, সিরাজগঞ্জের তাঁত, দিনাজপুরের লিচু, যশোরের খেজুরগুড় কিংবা অষ্টগ্রামের পনিরের মতো পণ্যকেও একই কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরেই মিলবে ঋণ

তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে রাখা হয়েছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও আধুনিক অর্থায়ন ব্যবস্থা।

এখানে প্রচলিত জামানতভিত্তিক ঋণ পদ্ধতির পরিবর্তে উদ্যোক্তার ব্যবসার নগদ প্রবাহ (Cash Flow), বিক্রির ইতিহাস, ডিজিটাল লেনদেন, উৎপাদন সক্ষমতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোর তৈরি করা হবে।

এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা ক্ষুদ্র কৃষক, নারী উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ কারিগররাও সহজে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের আওতায় আসতে পারবেন।

এ নতুন কাঠামোতে তিন ধরনের অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে- ক্ষুদ্র কৃষক ও উৎপাদকদের জন্য ইনপুট লোন; প্রক্রিয়াজাতকারী ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই ঋণ; বড় সরবরাহকারী ও রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য সাপ্লাই চেইন ও এক্সপোর্ট ফাইন্যান্স।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর অপ্রাতিষ্ঠানিক উচ্চসুদের ঋণের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।


স্থানীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা

চতুর্থ স্তম্ভ হচ্ছে বাজার সংযোগ ও ব্র্যান্ডিং।

বাংলাদেশের বহু ঐতিহ্যবাহী পণ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হলেও সেগুলোর অধিকাংশেরই কোনো স্বীকৃত ব্র্যান্ড পরিচয় নেই। ফলে একই ধরনের বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ে।

এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে প্রতিটি নির্বাচিত পণ্যকে তার ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নতুনভাবে ব্র্যান্ডিং করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এর পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় 'বাংলাদেশ ওভিওপি' ডিজিটাল মার্কেটপ্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে, যেখানে দেশি ও বিদেশি পাইকার, খুচরা বিক্রেতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সরাসরি উৎপাদক বা ক্লাস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন।

এ উদ্যোগের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদক ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।


শক্তিশালী সুশাসন কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা

পঞ্চম স্তম্ভ হিসেবে রাখা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সুশাসন।

এ লক্ষ্যে একটি পাঁচস্তরবিশিষ্ট পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর শীর্ষে থাকবে ন্যাশনাল ওভিওপি কাউন্সিল, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এসএমই ফাউন্ডেশন, পিকেএসএফ, বেসরকারি খাতের বড় শিল্পগোষ্ঠী, ডিজিটাল মার্কেটপ্ল্যাটফর্ম এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প সমন্বয়ের অভাবে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাই হবে এই কাঠামোর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

ওভিওপি কর্মসূচির ষষ্ঠ নীতিগত স্তম্ভ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে। নীতিনির্ধারকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত মূলধন কিংবা উন্নত বাজারব্যবস্থা থাকলেও দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কোনো শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। বিশেষ করে কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পে প্রজন্মান্তরে চলে আসা ঐতিহ্যগত দক্ষতার সঙ্গে আধুনিক উৎপাদন কৌশল, মান নিয়ন্ত্রণ, নকশা উন্নয়ন, ডিজিটাল বিপণন এবং উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনার সমন্বয় ঘটানো এখন সময়ের দাবি।

এ লক্ষ্যেই গ্রামীণ যুবক-যুবতী, নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র কৃষক, কারিগর এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তিন ধাপের- বেসিক, ইন্টারমিডিয়েট ও অ্যাডভান্সড- প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণে শুধু উৎপাদন কৌশল নয়; আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল লেনদেন, ব্র্যান্ডিং, ই-কমার্স, আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড, পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

নীতিপত্র অনুযায়ী, এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নারীদের অংশগ্রহণ কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা গেলে শুধু পারিবারিক আয়ই বাড়বে না, দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।


প্রযুক্তিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির পথে

ওভিওপি কর্মসূচির সপ্তম ও শেষ স্তম্ভ হচ্ছে একটি সমন্বিত ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর্মসূচির আওতাভুক্ত প্রতিটি উৎপাদককে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল প্রডিউসার আইডি প্রদান করা হবে। এই পরিচয়ের মাধ্যমে উৎপাদন, ঋণ গ্রহণ, প্রশিক্ষণ, বিক্রয়, বাজারসংযোগ এবং সরকারি সহায়তার সব তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকবে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কোনো উদ্যোক্তার ব্যাংকিং ইতিহাস সীমিত হলেও তাঁর উৎপাদন, বিক্রয়, ডিজিটাল লেনদেন এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণযোগ্যতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

এছাড়া প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে কিউআর কোডভিত্তিক ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে একজন বিদেশি ক্রেতাও মোবাইল ফোনে কিউআর কোড স্ক্যান করে জানতে পারবেন- পণ্যটি কোন গ্রামের, কোন উৎপাদকের, কখন উৎপাদিত হয়েছে এবং কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তার আস্থা তৈরিতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ, তিন বছরের রোডম্যাপ

ওভিওপি কর্মসূচি বাস্তবায়নে আগামী তিন বছরের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী- মোট বরাদ্দের ৪০ শতাংশ থাকবে ঋণ ও অর্থায়ন ব্যবস্থার জন্য; ৩৬ শতাংশ ব্যয় হবে বাজার উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং ও বিপণনে; ১৩ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ক্লাস্টার উন্নয়নে; অবশিষ্ট ১১ শতাংশ ব্যয় হবে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে।

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এই অর্থায়নকে কেন্দ্র করে বেসরকারি খাতের অতিরিক্ত বিনিয়োগ যুক্ত হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ ও বিনিয়োগের প্রবাহ পাঁচ থেকে দশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

কর্মসূচির বাস্তবায়নও ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রথম বছরে সম্ভাবনাময় ক্লাস্টার নির্বাচন, উৎপাদকদের ডিজিটাল নিবন্ধন, তথ্যভান্ডার তৈরি এবং প্রাথমিক অর্থায়নের কাজ শুরু হবে।

দ্বিতীয় বছরে কর্মসূচি দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে চালু হবে কেন্দ্রীয় বাংলাদেশ ওভিওপি ডিজিটাল মার্কেটপ্ল্যাটফর্ম, যেখানে উৎপাদক, ক্রেতা, ব্যাংক ও রপ্তানিকারকরা একই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকবেন।

তৃতীয় বছরে দেশের প্রায় ৬৮ হাজার গ্রামের এক কোটিরও বেশি উৎপাদক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও কারিগরকে একটি সমন্বিত জাতীয় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকই হবে পুরো কর্মসূচির চালিকাশক্তি

এই বিশাল কর্মসূচির আর্থিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রিফাইন্যান্স স্কিম, ক্রেডিট গ্যারান্টি সুবিধা, এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে প্রস্তাবিত প্রাইভেট ক্রেডিট ব্যুরো- এসব উদ্যোগকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকারদের মতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রান্তিক উৎপাদকদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ইতিহাস তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে ঋণপ্রাপ্তি আরও সহজ করবে।


ঐতিহ্যকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়াই মূল লক্ষ্য

ওভিওপি কর্মসূচির রূপরেখা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে উপস্থাপন করেছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান এবং সিটি ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের নেতৃত্বাধীন বাস্তবায়ন কমিটি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য গ্রামে এমন অনেক ঐতিহ্যবাহী ও বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদিত হয়, যেগুলোর গুণগত মান আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা, সীমিত অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, দুর্বল বাজারসংযোগ এবং কার্যকর ব্র্যান্ডিং না থাকায় সেই সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটছে না।

মাসরুর আরেফিন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু ঋণ বিতরণ নয়; বরং প্রতিটি সম্ভাবনাময় গ্রামীণ পণ্যকে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্র্যান্ডে রূপান্তর করা। উৎপাদক, ব্যাংক, প্রযুক্তি, বাজার এবং রপ্তানিকে একই মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় শিল্পের প্রকৃত রূপান্তর সম্ভব হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব পরিচয়বাহী পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।”

তিনি আরও বলেন, “যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এই কর্মসূচি শুধু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগই বাড়াবে না; বরং দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”


গ্রামের পণ্য থেকে জাতীয় সম্পদ

বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে গ্রামীণ অর্থনীতি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় উৎপাদকদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের অর্থনৈতিক মূল্য যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়নি। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় শিল্প হারিয়ে গেছে, আবার অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা বিলুপ্তির মুখে পড়েছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, ওভিওপি কর্মসূচির মাধ্যমে যদি স্থানীয় পণ্যকে উৎপাদন, প্রযুক্তি, অর্থায়ন, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, অতীতের অনেক সম্ভাবনাময় কর্মসূচির মতো এ উদ্যোগও যেন কেবল নীতিপত্র বা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, জবাবদিহি, দক্ষ তদারকি এবং প্রান্তিক উৎপাদকদের বাস্তব অংশগ্রহণের ওপর।

কারণ, একটি গ্রামের পণ্যকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়া শুধু অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়- এটি একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের দক্ষতা এবং জীবনসংগ্রামকে বৈশ্বিক পরিচয়ে রূপ দেওয়ারও একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়া সফল হলে বাংলাদেশের হাজারো গ্রাম শুধু উৎপাদনের কেন্দ্রই হবে না, বরং দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির নতুন ভিত্তিও হয়ে উঠতে পারে।

COMMENTS


Developed by Julius Choudhury
নাম

অপরাধ,107,অর্থনীতি,177,অস্ট্রেলিয়া,1,আইন ও আদালত,39,আন্তর্জাতিক,108,আবহাওয়া,29,আশুলিয়া,1,ইরান,2,এভিয়েশন,3,কক্সবাজার,7,কলকাতা,2,কিশোরগঞ্জ,18,কুড়িগ্রাম,15,কুমিল্লা,5,কুষ্টিয়া,8,কূটনীতি,3,কৃষি,16,ক্যাম্পাস,15,খাগড়াছড়ি,1,খুলনা,1,খেলা,89,গণমাধ্যম,184,গাইবান্ধা,2,গাজীপুর,223,গোপালগঞ্জ,5,চট্টগ্রাম,17,চাঁদপুর,1,চাকরি,6,জয়পুরহাট,2,জাতীয়,208,জাপান,1,জামালপুর,5,জীবনধারা,1,টাঙ্গাইল,7,ঠাকুরগাঁও,1,ঢাকা,1,ঢাবি,2,তুরস্ক,1,দিনাজপুর,17,ধর্ম,24,নড়াইল,3,নবাবগঞ্জ,1,নরসিংদী,12,নাটোর,2,নির্বাচন,15,নীলফামারী,1,নেত্রকোণা,8,নেপাল,3,নোয়াখালী,2,পটুয়াখালী,1,পরিবেশ,12,পাকিস্তান,3,পাবনা,132,প্রবাস,6,প্রযুক্তি,61,ফটো,1,ফিলিপাইন,1,ফেনী,5,বগুড়া,2,বরিশাল,3,বাং,1,বাংলাদেশ,4,বাগেরহাট,2,বান্দরবান,10,বিচিত্র,2,বিনোদন,23,বিশেষ প্রতিবেদন,19,বিশ্ব,300,বেনাপোল,1,ব্যাংক,4,ব্রাহ্মণবাড়িয়া,12,ভারত,15,ভুটান,1,ভ্রমণ,9,মতামত,14,মধ্যপ্রাচ্য,1,ময়মনসিংহ,14,মানিকগঞ্জ,1,মালয়েশিয়া,1,মিয়ানমার,1,মুন্সীগঞ্জ,2,মেহেরপুর,13,যশোর,1,যুক্তরাষ্ট্র,7,যোগাযোগ,3,রংপুর,274,রাঙ্গামাটি,1,রাজধানী,70,রাজনীতি,232,রাজশাহী,3,রাশিয়া,2,লক্ষ্মীপুর,4,লালমনিরহাট,4,শরীয়তপুর,2,শিক্ষা,121,শিল্প ও সংস্কৃতি,3,শেরপুর,1,সংস্কৃতি,7,সাতক্ষীরা,3,সাভার,3,সারাদেশ,645,সাহিত্য,11,সিলেট,6,সুনামগঞ্জ,1,স্বাস্থ্য,73,
ltr
item
NNB - News Network of Bangladesh: ঐতিহ্যের পণ্য থেকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ উদ্যোগে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি
ঐতিহ্যের পণ্য থেকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ উদ্যোগে বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি
১০ হাজার কোটি টাকার ওভিওপি পরিকল্পনা কি বদলে দেবে এমএসএমই খাত? গ্রাম থেকেই গড়ে উঠতে পারে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড।
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhdqt2jJ0tSEbYgULYn8puWg-vjrlcd2s9m4ge8235UfsoFsSe36ANENKS4_FnyNhg2ykfxBPf9SgvqJ7nd8xiwUvEngyrd1IaUNY9tlqtmFMXEpv1zWFXWCQMS2bKtbamlqBBC3aLAZQw25FZIlfm-O9ZpBnQCgHWHjrJBJOwJJ3bgWlNWg0u0uHuvlvM/s16000/one-village-one-product.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEhdqt2jJ0tSEbYgULYn8puWg-vjrlcd2s9m4ge8235UfsoFsSe36ANENKS4_FnyNhg2ykfxBPf9SgvqJ7nd8xiwUvEngyrd1IaUNY9tlqtmFMXEpv1zWFXWCQMS2bKtbamlqBBC3aLAZQw25FZIlfm-O9ZpBnQCgHWHjrJBJOwJJ3bgWlNWg0u0uHuvlvM/s72-c/one-village-one-product.jpg
NNB - News Network of Bangladesh
https://edition.nnb.com.bd/2026/06/0126062510.html
https://edition.nnb.com.bd/
https://edition.nnb.com.bd/
https://edition.nnb.com.bd/2026/06/0126062510.html
true
8430089477468953663
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts সব দেখনু Read More Reply Cancel reply Delete By হোম PAGES POSTS সব দেখনু সম্পর্কিত বিষয় ARCHIVE খোঁজ ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share to a social network STEP 2: Click the link on your social network Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy Table of Content