
এনএনবি, ঢাকা
সংবিধান পরিবর্তনকে হুমকি হিসেবে না দেখে গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য
বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত
আহমেদ। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সংবিধানের বিবর্তন অনিবার্য, আর বিচার বিভাগের
দায়িত্ব হলো সেই পরিবর্তনকে গণতান্ত্রিক সত্য হিসেবে মেনে নেওয়া।
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর ২০২৫) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ১ নম্বর
বিচারকক্ষে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব সংবিধানকে বাতিল বা উল্টে দেওয়ার কথা
বলেনি; বরং সংবিধানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আরও শুদ্ধ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল
করার দাবি জানিয়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সংবেদনশীলতা—এই তিনটি মূল্যবোধই আজ
জনমানুষের বিবেকের মূল ভিত্তি।’
অনিশ্চয়তা ও সংকটপূর্ণ সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ওই সময়ে বিচার বিভাগই
একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দৃঢ় অবস্থান
নিয়েছিল। বিচার বিভাগ নিশ্চিত করেছে—কোনো অধিকার খর্ব হবে না, কোনো
প্রতিষ্ঠানকে বন্দী করা হবে না এবং কোনো নাগরিককে রাষ্ট্রের বাইরে ঠেলে দেওয়া
হবে না।
বিচার বিভাগের শক্তি প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, এই শক্তি কোনো একক পদ বা
ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সততা, ভারসাম্য ও দূরদর্শিতার সঙ্গে
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারকদের সম্মিলিত অঙ্গীকারেই বিচার বিভাগের
প্রকৃত শক্তি নিহিত।
প্রথা অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির শেষ কর্মদিবসে তাকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী
সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বক্তব্য দেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল তার বক্তব্যে বলেন, প্রধান বিচারপতি হিসেবে স্বল্প সময়ের
মধ্যেই সৈয়দ রেফাত আহমেদ প্রজ্ঞা, মেধা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে একটি অনন্য
বিচারিক মানদণ্ড স্থাপন করেছেন, যাকে তিনি ‘দ্য রেফাত স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে
আখ্যায়িত করেন। তাঁর ভাষায়, এটি বিচারিক সাহস ও সর্বোচ্চ স্বচ্ছতার প্রতীক।
বিচার বিভাগীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক বিপ্লবী চেতনার অধিকারী
ব্যক্তিত্ব।
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন উত্তাল বিপ্লবের এক সন্ধিক্ষণে,
আর বিদায় নিচ্ছেন বিজয়, শান্তি ও স্বচ্ছতার এক অনন্য সময়ে।’
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, প্রধান
বিচারপতি নাগরিকদের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ আন্তরিকতা
দেখিয়েছেন। মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার
প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন এবং সমাজের সব স্তরে বৈষম্য দূরীকরণে ছিলেন সতর্ক ও
সক্রিয়।
বিদায় সংবর্ধনায় প্রধান বিচারপতির এজলাস আইনজীবী, আইন কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত
অতিথিদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ ছিল। অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের
বিচারপতিরাও উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ১১ আগস্ট
দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। সংবিধান
অনুযায়ী বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর। ১৯৫৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করা
প্রধান বিচারপতির বয়স ৬৭ বছরে পূর্ণ হচ্ছে আগামী ২৭ ডিসেম্বর। ওই দিন ছুটি
থাকায় বৃহস্পতিবারই ছিল তার শেষ কর্মদিবস।
COMMENTS