![]() |
| বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়। অভিযুক্ত মোবারক হোসেন (ইনসেটে)। ছবি : সংগৃহীত |
শাহীন রহমান, পাবনা
ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তার জন্য সরকারের বিশেষ কল্যাণ তহবিল। অসহায় মানুষের জীবনরক্ষার এই অর্থ যদি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়, তবে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই নয়, প্রকৃত রোগীরা বঞ্চিত হন তাদের ন্যায্য অধিকার থেকেও। পাবনায় এমনই এক গুরুতর অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পূর্ণ সুস্থ একজন নারীকে কাগজে-কলমে ক্যান্সার রোগী দেখিয়ে তার নামে সরকারি অনুদান অনুমোদন করিয়ে সেই অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। শুধু একটি ঘটনাই নয়, একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুরূপ আরও একাধিক অভিযোগের তথ্যও সামনে এসেছে।
অভিযুক্ত মোবারক হোসেন পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক। ২০১৮ সালে তিনি ওই পদে যোগ দেন। তার বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলার রানীনগর গ্রামে।
বেড়া উপজেলার জাতসাখিনী ইউনিয়নের রানীনগর গ্রামের বাসিন্দা শাকিল খান গত ২০ জুন রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তার স্ত্রী লিপি খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি প্রতিবেশী হওয়ার সুযোগে সংগ্রহ করে তার অজান্তেই সরকারি চিকিৎসা সহায়তার অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোতালেব সরকার তদন্ত করেন। গত ২৫ জুন তিনি রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান। ওই প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের সঙ্গে অনুদানের অর্থ উত্তোলনসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিও সংযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ ও ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে লিপি খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি বিভিন্ন কাজের কথা বলে সংগ্রহ করেন মোবারক হোসেন। বিষয়টি নিয়ে তখন পরিবারের কোনো সন্দেহ ছিল না।
কিন্তু সম্প্রতি পারিবারিক প্রয়োজনে স্ত্রীর নামে নতুন একটি ব্যাংক হিসাব খুলতে গিয়ে শাকিল খান জানতে পারেন, রূপালী ব্যাংকের নগরবাড়ী ঘাট শাখায় লিপি খাতুনের নামে আগে থেকেই একটি হিসাব খোলা রয়েছে।
পরে ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সরকারি চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে ওই হিসাবে ৫০ হাজার টাকা জমা হয়। মাত্র দুই দিন পর, ৭ সেপ্টেম্বর, রূপালী ব্যাংকের পাবনা করপোরেট শাখা থেকে পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট চেক বইও অভিযুক্ত কর্মচারীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এরপর সমাজসেবা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে শাকিল খান জানতে পারেন, তার সম্পূর্ণ সুস্থ স্ত্রীকে কাগজপত্রে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী দেখিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষ অনুদান অনুমোদন করানো হয়েছিল।
শাকিল খান বলেন, “আমি লেখাপড়া জানি না। পরিচিত ও প্রতিবেশী হওয়ার কারণে মোবারক আমার স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি নিয়েছিল। পরে জানতে পারি, আমার সম্পূর্ণ সুস্থ স্ত্রীকে ক্যান্সার রোগী বানিয়ে সরকারি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমার স্ত্রী কোনোদিন ক্যান্সার বা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হননি। আমি এই প্রতারণার বিচার চাই।”
তদন্তকারী কর্মকর্তা মোতালেব সরকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে লিপি খাতুনের নামে সরকারি অনুদানের অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য সংযুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মচারীর বিরুদ্ধে অতীতেও অনুরূপ অভিযোগ উঠেছিল।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন, জটিল রোগীদের সরকারি চিকিৎসা অনুদানের অর্থ ছাড় করে দেওয়ার নামে মোবারক হোসেন নিয়মিত টাকা দাবি করতেন।
রানীনগর গ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, “২০২২ সালে আমার বাবা রেজাউল ইসলাম ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর ৫০ হাজার টাকার সরকারি অনুদান মঞ্জুর হয়েছিল। সেই টাকা ছাড় করে দেওয়ার জন্য মোবারক আমার কাছ থেকে আগেই ২০ হাজার টাকা নিয়েছিল।”
একই গ্রামের বাসিন্দা হাসি আক্তার বলেন, “আমার স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও বহুবার ঘুরেও কোনো অনুদান পাইনি। অথচ আমার দেবর, যিনি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন না, তার নামে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ হাজার টাকার অনুদান তোলা হয়েছে বলে পরে জানতে পারি।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রকৃত রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পাশাপাশি সুস্থ ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া মেডিকেল কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি সংঘবদ্ধ কৌশল অনুসরণ করা হয়ে থাকতে পারে। অভিযোগগুলোর সত্যতা অবশ্য স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অফিস সহায়ক মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, “আমি এসব অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত নই। একটি কুচক্রী মহল দীর্ঘদিন ধরে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।”
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য ও অন্যান্য অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আর কোনো মন্তব্য না করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, চলতি অর্থবছরে চিকিৎসা অনুদান নিয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তার ভাষ্য, জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন এবং সমাজসেবা বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত যাচাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই অনুদান অনুমোদিত হয় এবং অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “এই প্রতিবেদন আপনি কোথা থেকে পেলেন? অফিসের যে এটি দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে, বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের নবাগত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিনি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। সব নথিপত্র পর্যালোচনা করার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করবেন।
পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, সরকারি চিকিৎসা সহায়তার অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকার প্রতিবছর জটিল রোগে আক্রান্ত দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা সহায়তায় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে যদি জাতীয় পরিচয়পত্র, ভুয়া চিকিৎসা সনদ, ব্যাংক হিসাব ও অনুদান প্রক্রিয়া ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে শুধু একটি নয়, আরও বহু ভুক্তভোগী আড়ালে থেকে যেতে পারেন।
এ ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে- একজন অফিস সহায়ক কীভাবে উপকারভোগীর ব্যক্তিগত নথি, ব্যাংক হিসাব ও অনুদান প্রক্রিয়ায় এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারলেন? যাচাই-বাছাই কমিটির একাধিক স্তর থাকা সত্ত্বেও ভুয়া রোগীর নামে অনুদান অনুমোদনের অভিযোগ কীভাবে উঠল? সংশ্লিষ্ট নথি, মেডিকেল সনদ, ব্যাংক হিসাব ও অর্থ উত্তোলনের পুরো প্রক্রিয়ায় আর কারা জড়িত ছিলেন?
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, শুধু বিভাগীয় তদন্ত নয়, প্রয়োজন হলে দুদক, জেলা প্রশাসন এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে অতীতের সব চিকিৎসা অনুদানের ফাইল ও উপকারভোগীদের তথ্য পুনরায় যাচাই করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।

COMMENTS