![]() |
| প্রতিকী ছবি |
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি ও এআই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের পর গুগল, মেটা, অ্যানথ্রপিক, ওপেনএআই, এক্সএআই ও এনভিডিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা উন্নত এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা তদারকিতে একটি স্বেচ্ছামূলক কাঠামোতে সম্মত হন।
‘ফ্রন্টিয়ার দায়িত্ব বিষয়ে যৌথ অঙ্গীকার’ নামের এই চুক্তিতে উন্নত বা অত্যাধুনিক এআই মডেল তৈরির সময় শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, আলাদা তদারকি দল, স্বাধীন বাইরের নিরীক্ষা এবং পরিচালনা পর্ষদের একটি স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে। তবে এটি এখনই কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করছে না। ট্রাম্প চুক্তিটিকে ‘নৈতিকভাবে বাধ্যতামূলক’ হিসেবে বর্ণনা করলেও এর বাস্তবায়ন মূলত সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর স্বেচ্ছা অঙ্গীকারের ওপর নির্ভর করছে।
বৈঠকে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই, মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ এবং অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেইয়ের পাশাপাশি ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান, এক্সএআইয়ের ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেনসেন হুয়াং অংশ নেন। আরও কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও হোয়াইট হাউসের আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সামনে সুন্দর পিচাইকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় ট্রাম্প রসিকতা করে তাঁকে ‘দানব’ বলে উল্লেখ করেন। পিচাইয়ের সাফল্য ও প্রযুক্তি খাতে তাঁর প্রভাবের প্রশংসা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, এই মানুষটি একজন ‘দানব’, কিন্তু বিষয়টি অনেকেই জানেন না। মন্তব্যটি তিনি প্রশংসাসূচক ও রসিকতার ভঙ্গিতে করেন।
বৈঠকে আলোচিত নতুন কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো, অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলো প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারের সময় প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে কি না এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি দ্রুত শনাক্ত ও মোকাবিলা করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা। চুক্তিতে সাইবার নিরাপত্তা, জীববৈজ্ঞানিক ও রাসায়নিক ঝুঁকিসহ এআই ব্যবস্থার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অন্য প্রযুক্তি বা কম্পিউটার ব্যবস্থায় প্রবেশের মতো ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের কথাও বলা হয়েছে।
চুক্তিতে চার স্তরের নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষার কথা রয়েছে। প্রথমে কোম্পানিগুলোকে নিজেদের এআই ব্যবস্থার জন্য শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এরপর এসব নিয়ন্ত্রণ ঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য অভ্যন্তরীণ একটি দল রাখতে হবে। তৃতীয় স্তরে স্বাধীন বাইরের নিরীক্ষক বা মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবস্থা যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। চতুর্থ স্তরে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের একটি স্বাধীন কমিটি এসব অভ্যন্তরীণ ও বাইরের পর্যালোচনার ফলাফল দেখবে এবং শনাক্ত হওয়া সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।
পিচাই বলেন, এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রতিষ্ঠিত করপোরেট শাসন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োগ করতে পারে। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা হলো, এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পরিচালনাকে এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা, যেখানে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যালোচনার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকবে।
মার্ক জাকারবার্গও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও বাইরের নিরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তা যাচাই শুধু কোম্পানির নিজস্ব কর্মীদের ওপর নির্ভর করবে না। অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি পর্যালোচনার পাশাপাশি বাইরের নিরীক্ষা এবং পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীন পর্যালোচনাও থাকবে।
তবে চুক্তিতে বাইরের নিরীক্ষক কারা হবেন বা তাঁদের নির্বাচন কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বাধ্যতামূলক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। সমালোচকদের একটি বড় অংশের বক্তব্য, যে কোম্পানিগুলো নিজেরাই সবচেয়ে শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা তৈরি করছে, তাদের ওপর নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রধান দায়িত্ব ছেড়ে দিলে প্রকৃত স্বাধীন তদারকি কতটা নিশ্চিত হবে, সেটি স্পষ্ট নয়।
চুক্তিতে অবশ্য ভবিষ্যতে এসব পদক্ষেপ আইন বা আনুষ্ঠানিক বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। অর্থাৎ বর্তমানে এটি স্বেচ্ছামূলক হলেও ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা আইনি কাঠামোর অংশ হতে পারে।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই এআই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর প্রশাসনের যুক্তি হলো, এআই উন্নয়নে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে। এ কারণে ট্রাম্প বাধ্যতামূলক ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের বদলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বৈঠকের একই দিনে ট্রাম্পের প্রশাসন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘সুপার বুদ্ধিমত্তা’ শব্দ ব্যবহারের দিকে এগোয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পর্যায়ে নতুন পরিভাষাটি ব্যবহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, সরকার প্রযুক্তির উন্নত সক্ষমতাকে বোঝাতে এই নতুন পরিভাষা ব্যবহার করছে।
এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণও বৈঠকের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। উন্নত এআই মডেল চালাতে বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বড় আকারের তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার নির্মাণ দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এসব স্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার, পানি, পরিবেশ এবং অবকাঠামোর ওপর চাপ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
ট্রাম্প তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছেন, এসব প্রকল্প স্থানীয় অর্থনীতি ও অবকাঠামোয় বড় ধরনের সুবিধা আনতে পারে। তাঁর মতে, তথ্যকেন্দ্রগুলো বিপুল বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করে এবং স্থানীয় জনগণও এর আর্থিক সুফল পেতে পারে।
অন্যদিকে, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই দীর্ঘদিন ধরে উন্নত এআইয়ের সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। বৈঠকের পর তাঁর বক্তব্যেও সেই সতর্কতার প্রতিফলন দেখা যায়। আমোদেই বলেন, প্রযুক্তিটির বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং সেই ঝুঁকি মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন এআই ব্যবস্থার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কম্পিউটার ব্যবস্থা ব্যবহার বা সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঝুঁকি নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই সতর্কতা প্রকাশ করেছে। ফলে প্রযুক্তির সক্ষমতা যত বাড়ছে, নিরাপত্তা পরীক্ষা ও তদারকির প্রয়োজনীয়তাও তত বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে মঙ্গলবারের চুক্তিকে এআই নিরাপত্তা নিয়ে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয় এবং এতে স্বাধীন তদারকির পরিধি, নিরীক্ষকদের নির্বাচন এবং জনসমক্ষে নিরীক্ষার ফল প্রকাশের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে চুক্তিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে কোম্পানিগুলো তাদের অঙ্গীকার কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে এবং ভবিষ্যতে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কী ধরনের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেয় তার ওপর।
এখন পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের উদ্যোগটি মূলত একটি সমঝোতার সূচনা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এআই উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে উন্নত এআই ব্যবস্থার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চাপও বাড়ছে। এই দুই লক্ষ্যকে কীভাবে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া যায়, মঙ্গলবারের বৈঠক এবং নতুন স্বেচ্ছামূলক কাঠামো সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

COMMENTS