
এনএনবি
ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরে থাকা মানুষের কাছে নির্দিষ্ট
কিছু গন্ধ পাঠানোর প্রযুক্তি তৈরি করেছেন গবেষকেরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও
বিশেষ সেন্সরের সাহায্যে কমলা, কফি, কেক, বিয়ার ও রেড ওয়াইনের মতো পাঁচ ধরনের
খাবার ও পানীয়ের গন্ধ শনাক্ত করে তা পুনরায় তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। গবেষকদের আশা,
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে ভার্চ্যুয়াল জগৎ ও দূরবর্তী যোগাযোগে
ঘ্রাণের অনুভূতিও যুক্ত করা যাবে।
ধরা যাক, কেউ বাড়িতে মাফিন তৈরি করে
তার ছবি বন্ধুকে পাঠালেন। ভবিষ্যতে ছবির পাশাপাশি সেই মাফিনের সুগন্ধও
ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠানো সম্ভব হতে পারে। এমন সম্ভাবনা সামনে রেখে
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক চুনইয়ু ইয়াং ও তাঁর সহকর্মীরা
তৈরি করেছেন ‘সেন্ট্রনিক’ নামের একটি প্রযুক্তি।
গবেষকদের মতে,
ডিজিটাল মাধ্যমে ছবি, শব্দ এমনকি স্পর্শের অনুভূতি আদান-প্রদানের প্রযুক্তি অনেক
দূর এগিয়েছে। কিন্তু ঘ্রাণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি তুলনামূলক ধীর। এর প্রধান কারণ,
গন্ধ তৈরি হয় বিভিন্ন রাসায়নিক অণুর জটিল সমন্বয়ে। লাল, সবুজ ও নীল—এই তিনটি
মৌলিক রঙের সমন্বয়ে যেমন অসংখ্য রং তৈরি করা যায়, গন্ধের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সহজ
ও সর্বজনীন কাঠামো এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
যেভাবে কাজ করে সেন্ট্রনিক
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষকেরা তৈরি করেছেন একটি ইলেকট্রনিক নাক বা
‘ই-নোজ’ এবং গন্ধ পুনরুৎপাদনের বিশেষ যন্ত্র। ইলেকট্রনিক নাকটিতে রয়েছে ধাতব
অক্সাইড দিয়ে তৈরি একাধিক সেন্সর। অ্যালকোহলজাত পানীয়ের ইথানল কিংবা লেবুজাতীয়
ফলের লিমোনিনের মতো উদ্বায়ী রাসায়নিক উপাদান সেন্সরের সংস্পর্শে এলে এর বৈদ্যুতিক
রোধে পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের ভিত্তিতে প্রতিটি গন্ধের জন্য আলাদা সংকেত তৈরি
করা হয়।
এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সংকেতগুলো
বিশ্লেষণ ও গন্ধ শনাক্ত করার ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। এ জন্য প্রতিটি গন্ধের
সংস্পর্শে সেন্সরগুলোকে শত শতবার আনা হয়েছে, যাতে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করে এআই
মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়।
গবেষক চুনইয়ু ইয়াংয়ের মতে, বিভিন্ন
গন্ধের মধ্যে পার্থক্য নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে এআইকে প্রশিক্ষণ দেওয়াই ছিল
গবেষণার অন্যতম কঠিন কাজ।
গন্ধ শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট তথ্য
ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠানো হয় সেন্ট্রনিক যন্ত্রে। যন্ত্রটিতে পাঁচ ধরনের
সুগন্ধযুক্ত তরল রাখা ছোট পাত্র রয়েছে। সংকেত পাওয়ার পর বিশেষ অ্যাটোমাইজার তরলকে
অতি সূক্ষ্ম কণায় পরিণত করে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে ব্যবহারকারীর কাছে
নির্দিষ্ট গন্ধের অনুভূতি তৈরি হয়।
প্রযুক্তিটির হাতে বহনযোগ্য
সংস্করণ ১৪ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় তাঁরা গড়ে ৭৩ শতাংশ
ক্ষেত্রে সঠিক গন্ধ শনাক্ত করতে পেরেছেন। তবে এই ফলাফল এখনো সীমিতসংখ্যক গন্ধ ও
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল।
বিনোদন থেকে চিকিৎসায় ব্যবহারের সম্ভাবনা
গবেষকদের ধারণা, প্রযুক্তিটির প্রাথমিক ব্যবহার হতে পারে বিনোদনশিল্পে।
ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি বা ভার্চ্যুয়াল জগতের অভিজ্ঞতায় গন্ধ যুক্ত করা গেলে
ডিজিটাল পরিবেশ আরও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে। যেমন, ভার্চ্যুয়াল বাগানে ফুলের
সুবাস কিংবা ডিজিটাল রান্নাঘরে খাবারের গন্ধ অনুভব করা সম্ভব হতে পারে।
এ
ছাড়া মহাকাশচারী ও সেনাদের খাবার উপভোগ্য করে তোলা, ঘ্রাণশক্তির পরিবর্তন
পর্যবেক্ষণ এবং ভাইরাস-পরবর্তী জটিলতা বা স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগে ঘ্রাণের অনুভূতি
পরীক্ষা করার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি কাজে লাগতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
তবে
প্রযুক্তিটির ব্যবহারিক প্রয়োগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক মারিয়ানা ওব্রিস্ট মনে করেন, উদ্যোগটি
আশাব্যঞ্জক হলেও গন্ধ শনাক্ত করে সীমিতসংখ্যক সুগন্ধের ভান্ডার থেকে তা পুনরায়
তৈরি করা এখনো ছবি বা শব্দ আদান-প্রদানের মতো সহজ নয়।
মানুষের ঘ্রাণের
অভিজ্ঞতা অত্যন্ত জটিল। একটি প্রাকৃতিক গন্ধে অসংখ্য রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে,
যেগুলোর অনুপাত ও পারস্পরিক মিশ্রণ গন্ধের বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। তাই কোনো
গন্ধকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং তার মতো অনুভূতি আবার তৈরি করা দুটি পৃথক
চ্যালেঞ্জ।
গবেষকদের সামনে এখন প্রধান কাজ হলো আরও বেশি ধরনের গন্ধ
শনাক্ত করা, পুনরুৎপাদনের নির্ভুলতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিটিকে ব্যবহারবান্ধব করে
তোলা। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি এলে ভবিষ্যতে ডিজিটাল যোগাযোগে শুধু ছবি ও শব্দ নয়,
ঘ্রাণও হয়ে উঠতে পারে নতুন এক মাধ্যম।
COMMENTS