![]() |
| গাজীপুরের পশ্চিম জয়দেবপুরে কে ব্লকের ৩১৫/২ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলায় বিটেক কার্যালয়। ছবি: এনএনবি |
এনএনবি, গাজীপুর
গাজীপুরে ‘বিটেক কমিউনিকেশন ওপিসি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ঘিরে লাইসেন্সবিহীন এমএলএম ব্যবসা ও নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিজিটাল মার্কেটিং ও অনলাইন আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে অতীতে বহুল আলোচিত ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের কয়েকজন সাবেক পরিবেশক ও সংগঠকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গাজীপুর শহরের পশ্চিম জয়দেবপুরের লক্ষীপুরা রোডের কে ব্লকের ৩১৫/২ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলায় অবস্থিত কার্যালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ডেসটিনি-সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে সেখানে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের আড়ালে সদস্যভিত্তিক একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা এটিকে একটি ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দাবি করছেন, তবু এর কার্যক্রমে এমএলএম ও পিরামিড স্কিমের নানা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশে ‘মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ কার্যকর হওয়ার পর এমএলএম ব্যবসা পরিচালনার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়। একই আইনের ১৫ ধারায় সদস্য সংগ্রহনির্ভর পিরামিড বা স্তরভিত্তিক ব্যবসায়িক কাঠামো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বর্তমানে দেশে কার্যকর কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত এমএলএম প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নেই। বিটেক কমিউনিকেশন ওপিসির ক্ষেত্রেও এমন কোনো লাইসেন্সের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, উদ্বুদ্ধকরণ সভা ও বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সদস্য হতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রচারণায় ‘অল্প বিনিয়োগে বড় আয়’, ‘রেফারেল বোনাসের মাধ্যমে আর্থিক স্বাধীনতা’ এবং ‘ঘরে বসেই প্যাসিভ ইনকাম’-এর মতো বার্তা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন সদস্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাদের সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট দোকান থেকে সদস্যরা পণ্য কিনলে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অ্যাপে পয়েন্ট যুক্ত করেন। পরে ওই পয়েন্ট অর্থমূল্যে রূপান্তরিত হয়। এর একটি অংশ ক্রেতার হিসাবে জমা হয় এবং অপর অংশ প্রতিষ্ঠান পায়।
তবে অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, কেবল পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে সদস্য হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পয়েন্ট অর্জন করতে অনেক ক্ষেত্রেই বিপুল পরিমাণ কেনাকাটার প্রয়োজন হয়, যা সময়সাপেক্ষ। পাশাপাশি এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি অর্থের বিনিময়ে সদস্যপদ, পয়েন্ট বা কথিত ‘শেয়ার’ দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, একজন সদস্য নিজের রেফারেল নম্বর ব্যবহার করে নতুন সদস্য যুক্ত করলে কমিশন বা বোনাস পান। পরবর্তী সময়ে ওই সদস্যরা আবার নতুন সদস্য সংগ্রহ করলে কমিশনের একটি অংশ ওপরের স্তরের সদস্যদের কাছেও পৌঁছে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, সদস্য সংগ্রহের ওপর আয়নির্ভর এমন কাঠামো একটি নিয়োগভিত্তিক পিরামিড স্কিমের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিরামিড স্কিমের মূল ভিত্তি হলো নতুন সদস্যদের কাছ থেকে আসা অর্থ। যত দিন নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তত দিন পুরোনো সদস্যদের কিছু অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হয়। কিন্তু সদস্য সংগ্রহ কমে গেলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের ব্যবস্থায় অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন বলে তারা মনে করেন। কারণ, প্রকৃত পণ্য বা সেবার পরিবর্তে সদস্য সংগ্রহই তখন আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম পরিচালনা এবং পিরামিড স্কিম পরিচালনা দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনে অপরাধের ধরন অনুযায়ী তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা এবং প্রতারণা প্রমাণিত হলে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরতের বিধান রয়েছে।
এদিকে বিটেক কমিউনিকেশন ওপিসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে ব্যবসায়িক মডেল উপস্থাপন করতে দেখা যায়। তার বক্তব্যের পাশাপাশি প্রদর্শিত স্লাইডে সদস্যভিত্তিক নেটওয়ার্ক, রেফারেলের মাধ্যমে নতুন সদস্য যুক্ত করার প্রক্রিয়া, বিভিন্ন স্তরে কমিশন ও বোনাস পাওয়ার কাঠামো এবং সম্ভাব্য আয়ের বিভিন্ন স্তর তুলে ধরা হয়।
অনুসন্ধানে সংগৃহীত তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ভিডিওতে প্রদর্শিত ব্যবসায়িক কাঠামো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সদস্য সংগ্রহ ও রেফারেলনির্ভর আয়ের যে মডেল উপস্থাপন করা হয়েছে, তা এমএলএম বা পিরামিডধর্মী ব্যবসার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ভিডিও:

COMMENTS